দিনাজপুর বার্তা ২৪ | Dinajpur Barta 24

ব্রেকিং নিউজ
জয়নাল স্যারের আম বাগান
মোফাচ্ছিলুল মাজেদ জুন ২১, ২০২০, ১০:২৬ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে ১৪৩ বার |

আজহারুল আজাদ জুয়েল :-

আম রুপালি আম গাছ রোপণ করার পর সাধারনত ১০-১২ বছর পর্যন্ত ফলন দিয়ে থাকে। এরপর এই গাছের ফলন ভাল হয় না। তাই বিশেষজ্ঞগণ গাছটি কেটে নতুন গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু দিনাজপুরের জয়নাল স্যারের আম রুপালি আম বাগান যেন ব্যতিক্রম কিছু। এখানে অল্প বয়সী ছোট আমগাছে যেমন থোকা থোকা আম আছে, তেমনি ২০-২১ বছর বয়সী বড় আম রুপালি গাছেও ধরেছে গাছ ভর্তি আম। এত বড় ও এত দীর্ঘ বয়সী আম রুপালি আম গাছে গাছ ভর্তি আম দেখে অবাক হয়েছেন অনেকে।
জয়নাল স্যারের অবাক করা এই আম বাগান রয়েছে দিনাজপুর সদর উপজেলার শেখপুরা ইউনিয়নের দীঘন গ্রামে। দীঘনের ঝাড়–য়া দিঘীসহ দুইটি বড় দীঘির চতুরপাশের বিরাট জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে এই বাগান। ১৯ জুন সেই বাগানে গিয়ে গাছে গাছে থোকা থোকা আম দেখে মন ভরে গিয়েছিল। বাগান মালিক ও আম চাষী জয়নাল আবেদীন জানালেন, এই বাগানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাত শত আম রুপালি গাছ আছে। ১৫১টি আম রুপালি গাছের বয়স বিশ থেকে একুশ বছর। এর মধ্যে ৮০-৮৫টিতে প্রচুর আম হয়েছে। অন্যগুলোয় কম। আর যে গাছগুলো ছোট এবং বয়স কম সেই সব গাছের সবগুলোতেই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আম ধরেছে। আমপান ঝড়সহ তিনটি দূর্যোগে বিপুল পরিমাণ ফল ঝরে যাওয়ার পরেও গাছগুলোয় সব মিলিয়ে উৎপাদিত আমের সম্ভাব্য পরিমাণ হতে পারে ৬শ’ হতে ৭শ’ মন। যা গত বছরের চেয়ে দেড়-দুইশ’ মন বেশি হয়েছে বলে আমার ধারণা। গত বছর আম হয়েছিল ৫শ মনের চেয়ে একটু বেশি।

জয়নাল স্যারের আম বাগান

আম রুপালি গাছ ১০-১২ বছর হলেই ফলন পাওয়া যায় না এবং ফলন হলেও তাতে পোকা ধরে বলে শুনেছি। তাহলে ২০-২১ বছর বয়সী গাছে এত আম কিভাবে হলো? এমন এক প্রশ্নের জবাবে জয়নাল আবেদীন জানালেন, এইসব গাছে আম হবে কি হবে না, তা নির্ভর করে সঠিক পরিচর্যার উপরে। আম গাছেও খাবার দিতে হয়। কোন খাবারটা কখন, কোন সময়ে এবং কি পরিমাণে দিতে হবে তা জানা থাকলে এবং সেই মোতাবেক খাবার অর্থাৎ সার, পুষ্টি প্রয়োগ করলে গাছে ভালভাবেই মুকুল আসবে এবং আম ধরবে। আম ধরার পড়েও পরিচর্যা করতে হবে যেন আম সঠিকভাবে পুষ্ট হয় এবং ঝরে না যায়, না ফেটে যায় এবং পোকা না ধরে। পরিচর্যাই আসল। সময়মত পরিচর্যা করলে ফলন হতে সমস্য হবে না এবং পোকাও ধরবে না।
জয়নাল আবেদীন এক সময় দিনাজপুর সঙ্গীত ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। সেই কারণে তাঁর অধিক পরিচিতি হলো ‘জয়নাল স্যার’ হিসেবে। তাঁর পিতা মৃত আলহাজ¦ তফিরউদ্দিন আহমেদ, মায়ের নাম মৃত আলহাজ¦ জমিলা খাতুন। পিতা দীঘন গ্রামের এক সম্মানীয় ও উপজেলা প্রশাসন হতে আদর্শ কৃষক হিসেবে পুরস্কৃত কৃষক ছিলেন। সেই সূত্রে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে বিশেষ ভাবে পরিচিত ছিলেন। পিতার সাথে জয়নাল আবেদীন লেখাপড়ার সাথে সাথে নিজেও কৃষি কাজ করতেন। তাই কৃষি সম্পর্কে তার মধ্যে এক ধরণের প্র্যাকটিক্যাল ধারণা অল্প বয়স থেকেই হয়েছিল। কৃষি চর্চা ও সাধারন লেখাপড়ার পাশাপাশি সঙ্গীতের বিষয় নিয়েও লেখাপড়া করতেন তিনি। একদা দিনাজপুর জেলায় একজন সঙ্গীতজ্ঞ মানুষ হিসেবে পরিচিতিও লাভ করেন।
রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় হতে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্বৃতিতে মাস্টার্স ডিগ্রীধারী জয়নাল আবেদীন দিনাজপুর সংগীত ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে পরে অধ্যক্ষের দায়িত্বে নিয়োগ পেয়েছিলেন। কলেজ শিক্ষক ও অধ্যক্ষ হিসেবে প্রায় ২৭ বছর জড়িত থাকার কারণে সর্ব মহলে পরিচিতি পেয়েছিলেন জয়নাল স্যার হিসেবে। এখন শিক্ষকতা না করলেও জয়নাল স্যার পরিচিতি রয়েই গেছে। এখন তিনি আম বাগান করছেন। মাঝে লিচু করেছিলেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে সব লিচু তুলে ফেলে আমের মধ্যে ঝুঁকেছেন। চাকুরি ছাড়ার পর প্রথমে মাছ চাষে জড়িত হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তার উপলব্ধি হয়েছে যে, মাছে ও লিচুতে ঝামেলা বেশি, শ্রম বেশি, ঝুঁকিও বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় লাভ কম। এর চেয়ে আম চাষে ঝুঁকি কম, লাভ বেশি। তাই তিনি মনযোগ দিয়েছেন আম বাগান সম্প্রসারণ ও গবেষণায়। অবশ্য গবেষণাটি প্রাতিষ্ঠানিক নয়, প্র্যাকটিক্যাল। তিনি নিজে আমের চারা কলম ও রোপণ করেন যেন চারাটি সঠিক হয়। তার মধ্যে চারার মধ্যে ক্রুটি থাকলে ফলন কখনো ভাল হবে না।
জয়নাল আবেদীন ১৯৬৮ সালে দিনাজপুরের প্রসিদ্ধ মহারাজা স্কুল থেকে এস.এস.সি, ১৯৭০ সালে দিনাজপুর সরকারী কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৭৩ সালে বিএ পাস করেন। ১৯৭৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে এমএ পাস করেন। সাধারন লেখাপড়ার বাইরেও সংগীতের প্রতি বিশেষ অনুরাগের কারণে তিনি সংগীত নিয়েও লেখাপড়া করেছিলেন। ১৯৮৬ সালে ঢাকা মিউজিক কলেজ থেকে সঙ্গীতের উপর ডিগ্রী পাস করেন। তার কর্ম জীবন শুরু হয় দিনাজপুর সংগীত কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে। ১৯৮১ সালে এই কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ৫ বছর প্রভাষক হিসেবে কাজ করার পর ১৯৮৬ সালে অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য তিনি ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ^বিদ্যালয় থেকে সঙ্গীতের উপর ১৯৯৫ সালে অনার্স এবং ১৯৯৭ সালে মাষ্টার্স করেন। ২৭ বছরের শিক্ষকতা জীবনে ২২ বছরের বেশি সময় ধরেই দিনাজপুর সংগীত মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। ২০০৮ সালে চাকুরী ছেড়ে দেন। অবসরে যাওয়ার পর দীঘনে নিজ পুকুরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু করেন। এর সাথে সাথে পুকুরধারে আম রুপালি আম গাছ লাগিয়ে আম চাষের দিকে মনোযোগ দেন। তবে এখন নিজে মাছ চাষ না করে শুধু আম বাগান নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। পুকুর গুলো অন্য লোককে বছর ভিত্তিক মেয়াদে ভাড়া দিয়ে টেনশন মুক্ত জীবন যাপন করছেন।

২১ বছর বয়সী আম রুপালি আম গাছের সামনে
জয়নাল আবেদীন (মাঝে) ও দুজন অতিথি।

অবশ্য এ বছর আম বাজারজাতকরণ নিয়ে বেশ সংকটে আছেন অধ্যক্ষ জয়নাল। সাধারনত তিনি প্রতি বছর পুরো বাগানের আম গাছে থাকা অবস্থায় ঠিকা দরে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু এই বছর করোনা সংকটের কারণে এখনো উপযুক্ত পাইকার পান নাই বলে জানালেন। উপযুক্ত পাইকার না পেলে আম ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে পরিবহন নিয়ে একটা ঝামেলা হতে পারে। তবে প্রয়োজন হলে পরিবহনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক তৌহিদ ইকবাল করে দিবেন বলে আশ^াস দিয়েছেন, জানালেন অধ্যক্ষ জয়নাল। তিনি এটাও জানালেন যে, ঢাকায় এর আগে কখনো আম নিয়ে যান নাই। তিনি ওভাবে আম বিক্রিতে অভ্যস্থও নন। বাগানে থাকতে থাকতেই আম পাইকারদের হাতে তুলে দিয়েছেন প্রতিবার। এবারেও তেমনটা হলেই তার জন্য ভাল। তিনি আমগাছের পরিচর্যা ও ফলন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দেয়ার জন্য দিনাজপুর হর্টিকালচারের উপ-পরিচালক প্রদীপ কুমার ঘোষ ও তার অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আম রুপালি একটা সিজিনাল আম। অল্প কিছুদিনের জন্য এই আম বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে মানুষের মন ভরে না। সারা বছর আম পাওয়া গেলে কতই না ভাল হতো। সারা বছর আম যেন পাওয়া যায় তার জন্য বারোমাসি আম চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন অধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীন। থাইল্যান্ডের ‘কাটিমন’ জাতের বারোমাসি আম গাছের ছয় হাজার চারা তৈরী করেছেন তিনি। যে কেউ প্রতিটি চারা দুইশ’ টাকা দরে নিয়ে গিয়ে তাদের নিজ বাড়িতে রোপণ করলে বারো মাসেই আম পাবেন, জানালেন তিনি।
আমের মৌসুমে জয়নাল স্যারের আম বাগান দেখে যায় অনেকে। গত বছর পশ্চিমবঙ্গের একজন বিখ্যাত লেখক অধ্যাপক মলয় চন্দ্র মূখার্জী এসে এই আমবাগানে বেশ কিছু সময় কাটিয়েছিলেন। একজন সাবেক অধ্যক্ষের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেছিলেন, অনেকে শিক্ষিত হওয়ার পর কৃষি থেকে দূরে সরে যান। কিন্তু জয়নাল আবেদীন কৃষির মধ্যে থেকে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক তৌহিদ ইকবাল বলেন, অধ্যক্ষ জয়নাল আধুনিক পদ্ধতিতে আম আবাদ করে নিজেকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার আমের বাজারজাত করণ নিয়ে দু:শ্চিন্তায় আছেন। তবে আমি বলেছি, দুশ্চিন্তা করবেন না. ঢাকায় আম পাঠানোর জন্য আমি সব রকমের সহায়তা দিব।

দুইটি বড় পুকুরের চতুরপাশের বিরাট জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে জয়নাল স্যারের আম বাগান। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার আম গাছ ও চারা রয়েছে এই বাগানে। গাছের প্রায় সবই আম রুপালি। তবে চারার সিংহভাগ হলো বারো মাসি কাটিমন আম। যখন প্রথম বাগান করেছিলেন, তখন বাগানের গাছ লাগানোর সাথে সাথে মাছ চাষ করতেন। তখন দুইটি বড় পুকুরসহ আরো কয়েকটি ছোট পুকুর ছিল। যে পুকুরগুলোয় নানান জাতের মাছ চাষ করতেন। তখন তিনি বায়ো গ্যাস উৎপাদনে যুক্ত ছিলেন। লিচু, কলা, কূলও আবাদ করতেন। এখন সব বাদ দিয়ে শুধু আম রুপালি আমের বাগান নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। আম গাছের ফাঁকে ফাঁকে লাগিয়েছেন পেঁপেঁ ও লেবু গাছ যা বাড়তি ফসল হিসেবে আবাদ করছেন। আর বারো মাসি চারা লাগিয়ে দিনাজপুরের মানুষের কাছে বছর জুড়ে আম পাবার ব্যবস্থা করেছেন। আম চাষী হিসেবে সফল তিনি। তবে বারো মাসি আম নিয়ে কতটা সফল হন, তা এখন দেখার বিষয়। তবে তিনি তার উপশহরের বাড়ির ছাদে বড় বড় টবের মধ্যে ২৬টি বারো মাসি কাটিমন গাছ লাগিয়েছেন এবং প্রত্যেকটি গাছে বড় বড় আম ধরেছে। এ কারণে তিনি আশাবাদি যে আম রুপালির মত কাটিমন আম নিয়েও তিনি সফল হবেন। জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী খায়রুন নাহার আনোয়ারা শিকদার-সৈয়দপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। এখন অবসরে। বাড়ির ছাদে লাগানো গাছের পরিচর্যায় তিনি সহযোগিতা করে থাকেন। তাদের দুই পুত্রের মধ্যে বড় মাহমুদ ফিরোজ মাষ্টার্স করে দিনাজপুর কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা করছেন। ছোট মাহামুদ ফেরদৌস ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড ইলেক্টিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারে বুয়েটে স্নাতক করে কানাডায় চাকুরি করছেন। জয়নাল আবেদীন বলেন, আমার আশে-পাশের অনেকেই চারা নিয়ে লাগিয়েছেন। দু-একজন আমার চারা বিমানে করে ঢাকায় নিয়ে গেছেন। এইসব চারার সুফল আগামী দু-এক বছরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আজহারুল আজাদ জুয়েল
সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

এই পাতার আরো খবর -
১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
দিনাজপুর, বাংলাদেশ
ওয়াক্তসময়
সুবহে সাদিকভোর ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
সূর্যোদয়ভোর ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ
যোহরদুপুর ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
আছরবিকাল ৪:২৩ অপরাহ্ণ
মাগরিবসন্ধ্যা ৬:০৫ অপরাহ্ণ
এশা রাত ৭:২২ অপরাহ্ণ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকীয়