দিনাজপুর বার্তা ২৪ | Dinajpur Barta 24

ব্রেকিং নিউজ
স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক অধ্যাপক ইউসুফ আলী
মোফাচ্ছিলুল মাজেদ জুন ১২, ২০২০, ৫:৫৩ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে ১৯১ বার |

আজহারুল আজাদ জুয়েল :- দিনাজপুরের রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রয়াত অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী ছিরেন কিংবদন্তিতূল্য এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জন্ম দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ফরক্কাবাদ গ্রামে, ১৯২৩ সালে । পিতা মরহুম মোঃ গফুরউদ্দীন সাহা, মাতাঃ মরহুমা মোছাঃ নছিরা খাতুন। মৃত্যু ১৯৯৮ সালের ৩ ডিসেম্বর। ২ পুত্র ও ৫ কন্যার জনক অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিরল-কাহারোল হতে জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামন্য অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন।
জন্মস্থান ফরক্কাবাদ গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দিনাজপুর একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। ১৯৪৪ সালে মেট্রিক পাস করেন। এরপর রিপন কলেজ হতে আই.এ এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজ হতে বি.এ পাস করেন । ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় হতে বাংলা ভাষা ও সহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সূত্রেই তার সাথে পরিচয় ঘটে বঙ্গবন্ধুর। পরিচয়ের সূত্রে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬০ সালে যোগ দেন রাজনীতির পোড়খাওয়া দল আওয়ামী লীগে। ১৯৬২ সালে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দিনাজপুর হতে পূর্ব পাকিস্তান আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবেও পাকিস্তান গণ-পরিষদে দ্বিতীয় বারের মত সদস্য নির্বাচিত হন।
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে এমএ ডিগ্রি লাভের পর প্রথমে রাজশাহীর নবাবগঞ্জ কলেজে, পরে দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যাপনা করেন। সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যাপনাকালে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় হতে বিএল ডিগ্রী নিয়ে দিনাজপুর বারে আইন পেশায় যোগ দেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের দায়েরকৃত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরোধী আন্দোলন, উনসত্তুরের গণ আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনসহ সকল গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন এবং নেতৃত্ব দেন।
তিনি মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হিসেবে সেই সময়ের উত্তাল ও ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দিনাজপুরে দলকে যোগ্যতরভাবে নেতৃত্ব দেন। রাজনৈতিক কারণে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের আ¤্রকাননে মুজিবনগর সরকার গঠনের সময় স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠ করে নিজেকে আলোকিত করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপুর্ণ অবদান এখন ইতিহাসের অংশ। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ ছাড়া আরও অনেক গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন মুক্তিযুদ্ধে। তিনি মুজিবনগর সরকারের ইয়োথ কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এটা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্ট ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। এছাড়া এ এইচ এম কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের অনারারি মহাসচিবের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। কলকাতায় মুজিবনগর সরকারের প্রথম লিয়াজোঁ অফিস পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দিনাজপুরের এই কৃতি সন্তান।
তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম মন্ত্রী পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য ছিরেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত প্রথম মন্ত্রীসভায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রী তিনি। পরে সকল রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠন হলে অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৭৫ সালে বাকশাল মন্ত্রীসভায় শ্রমমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি বাকশালের ¤্রমিক ফ্রন্ট পরিচালনার দায়িত্বেও ছিলেন।
১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে স্বপরিবারে হত্যার ঘটনা ঘটে যার জের ধরে বাংলাদেশের সেই সময়ের কুসুমাস্তীর্ণ রাজনীতিতে ব্যাপক পালাবদল ঘটে ও একটি অপরিচ্ছন্ন অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা পরিকল্পনার সাথে অভিযুক্ত খন্দকার মোশতাকের মন্ত্যীসভায় যোগ দিয়ে নিজের রাজনৈতিক জীবনকে কলংকিত করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। তিনি মোশতাক সরকারের শ্রম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ পালন করেন। শুধু তাই নয়, ১৯৭৭ সালে আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে আরেকটি নতুন আওয়ামী লীগের জন্ম দেন যার নেতৃত্বে ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। নতুন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। কিন্তু একটি দলের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক হওয়ার পরেও ১৯৭৭ সালের সাধারন নির্বাচনে দিনাজপুর-৭ আসন হতে প্রতিদন্ধীতা করে হেরে যান। ঐ নির্বাচনে তার মই মার্কা বিপুল ভোটে হেরে যায় মূল আওয়ামী লীগের (আব্দুল মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন) নৌকা মার্কার কাছে। অথচ নৌকার প্রার্থী সতীশ চন্দ্র রায় তখন ছিলেন একটি অপরিচিত মুখ।
ঐ নির্বাচনের কিছুদিন পর অধ্যাপক ইউসুফ আলী বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় বস্ত্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের মন্ত্রীসভায় পাট ও বস্ত্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন লে. জেনারেল হুসেইন মূহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর তিনি জাতীয় পার্টি নামের নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৮৫ সালে এরশাদের গড়া জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ১৯৮৬ সালে ত্রাণ ও পুনর্বসন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় এরশাদকে দিনাজপুরে নিয়ে এসে কাঞ্চন সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করান। কিন্তু এর কয়েক মাস পরই পদত্যাগ করেন এবং রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে অনেকটা নীরব জীবন যাপন করেন।
অধ্যাপক ইউসুফ আলী নরম সুরে কথা বলতেন। এই কারনে ‘মিঠা বাবাজী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এটা তার জন্য একসময় পজিটিভ ছিল থাকলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে সেই সরকারের মন্ত্রী পরিষদে যোগ দেয়ার কারনে তার ‘মিঠা বাবাজী’ পরিচয়টা অনেকে ব্যাঙ্গ অর্থে ব্যবহার করেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রসভায় যোগ দেয়ার বিষয়টিা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে অতিমাত্রায় বিতর্কিত করে। অথচ তিনি একজন সাহিত্য ও সংস্কৃতি মনা লোক ছিলেন। পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকতাও করেছেন অল্প সময়ের জন্য।
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে প্রথম সারির একজন সংগঠক হলেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় স্যালুট থেকে বঞ্চিত হন স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী এই নেতা। অবশ্য মোস্তাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দিলেও তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার কোন অভিযোগ কখনো উত্থাপিত হয় নাই। বঙ্গবন্ধু হত্যা প্রসঙ্গে আমি (আজহারুল আজাদ জুয়েল) তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ১৯৯৬ সালে, যা ১৯৯৬ সালের ১৮-২২ অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ৪ দিন দৈনিক তিস্তায় ‘একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ইউসুফ আলী/বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যার যে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো;
প্রশ্ন : আপনি বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, সেই প্রেক্ষাপট যদি বলতেন।
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনকালে মেহেরপুরে আমার উপর স্বাধীনতার সনদ পাঠের দায়িত্ব বর্তেছিল। ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীদের শপথ বাক্য পড়ানোর দায়িত্বও ছিল আমার উপর। আমি মুজিবনগর সরকারে প্রথমত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির অনারারী সেক্রেটারী ছিলাম। সরকারের সিদ্ধান্ত ক্রমে ইয়োথ ক্যাম্পে কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছিলাম। আমাকে মুজিবনগর সরকারের হেড কোয়ার্টারে থাকতে হতো। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হতো। ক্যাবিনেটের প্রতি মিটিংয়ে যুবকদের রিক্রুট ও রিফিউজিদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হতো। আমার সেক্রেটারী ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের উইং কমান্ডার এস আর মির্জা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় নতুন মন্ত্রী পরিষদ গঠন করা হলে আমাকেও পূর্ণ মন্ত্রী রাখা হয়েছিল। ২৬ ডিসেম্বর এই মন্ত্রী পরিষদের শপথ হয়। কিন্তু ঐদিন আমি শপথ নিতে পারিনি। শপথ নিয়েছিলাম ২৮ ডিসেম্বর।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় থাকা পর্যন্তই আপনি মন্ত্রী ছিলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঃ তার মৃত্যুর সময়কাল পর্যন্ত মন্ত্রী ছিলাম।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হবে, এটা কত আগের থেকে জানতেন?
ইউসুফ : বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ব্যাপারে আগে টের পাইনি। আমি বলতাম, তার নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা হওয়া উচিত। কিন্তু তিনি নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন না। তিনি বলতেন, বাংলার মানুষ আমাকে ভালবাসে। কেউ আমার ক্ষতি করবে তা বিশ^াস করি না।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর কিভাবে জেনেছেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দিন আমি মিন্টো রোডের ৯নং সরকারি বাসভবনে ছিলাম। আমার প্রাইভেট সেক্রেটারী কাইয়ুম সাহেব ছিলেন শুক্রাবাদে। রাত প্রায় পৌনে ৪টার দিকে আমার ওয়াইফ আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে বলে, কাইয়ুম সাহেব ডাকছেন। কাইয়ুম টেলিফোনে বললেন, ‘স্যার রেডিও আছে?’ বললাম, ‘আছে।’ তিনি বললেন, ‘অন করেন।’ আমি রেডিও অন করে স্তম্ভিত হয়ে মেজর ডালিমের বক্তব্য শুনলাম। ঐ সময় চারদিক থেকে গোলাগুলির শব্দও হচ্ছিল। আমার হাউজ গার্ড পুলিশকে বললাম, ‘দেখে আসো তো, কোথায় কি হচ্ছে?’ একজন বললেন, ‘স্যার, মনে হয় রমনা থানা আক্রমণ হয়েছে।’ হাউস গার্ড আন্দাজ করে এটা সেটা বললেও তারা বাইরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। এভাবে সকাল প্রায় হয়ে আসছিল। এমন সময়ই সৈনিক বোঝাই দুটো খোলা ট্রাককে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের দিকে এগিয়ে যেতে দেখতে পেলাম। তাদের আচরণ ঔদ্ধত্বপুর্ণ বলে মনে হলো। আমি ভয় পাই। কি করব ভাবতে থাকি। কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সকাল সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত কিংকর্তব্য বিমুড় অবস্থায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বাড়িতেই ছিলাম। আমার বাড়ির পেছনে যশোহরের সোহরাব হোসেনের বাড়ি ছিল। সকাল সাড়ে ছয়টায় পাঞ্জাবী-লুঙ্গি পড়ে, কাঁটা তারের বেড়া টপকিয়ে তার বাড়িতে গেলাম। তাকে প্রশ্ন করলাম, এখন কি করব? সোহরাবের বাড়ির পেছনে ছিল জয়েন্ট সচিব মনোয়ার হোসেনের বাড়ি। আমরা দু’জনে তার বাসার দরজার কাছে গেলাম। ঠক ঠক করে দরজায় টোকা দিলাম। আমাদের গলার আওয়াজে মনোয়ার নিজে বের হলেন। আমাদেরকে তাড়াতাড়ি ঢুকিয়ে নিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন। এর ২০-২৫ মিনিট পর মনোয়ারের বাড়িতে আমার ওয়াইফ ফোন করে জানতে চাইলেন যে, আমার কোন অসুবিধা হয়েছে কি না। জানালাম, আপাতত হয় নাই। ওয়াইফ জানালেন, তারও কোন সমস্যা হয় নাই। তবে তিনি এও জানালেন যে, একটি সামরিক ট্যাংক জঙ্গী ভাব নিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাক করে ছিল। এরপর ট্যাংকটি চলে গেছে। ওয়াইফের সাথে আলাপ হওয়ার ১০-১৫ মিনিট পর বালুবাড়ির দোস্ত মোহাম্মদ (দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের প্রাক্তন ক্লার্ক) আমাকে ফোন করেন এবং আমার অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন। বিকাল বেলা ওয়াইফ ফোন করে মনোয়ারকে জানাল যে, একজন ভদ্রলোক একটি গাড়িতে করে আমাদের বাসায় গিয়ে এক ঘন্টার ব্যবধানে পর পর দুইবার আমার খোঁজ করেছে।
প্রশ্ন : আপনি কি মনোয়ার সাহেবের বাড়িতে থেকে গেলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : স্ত্রী-সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিকেল বেলা বাড়িতে চলে এলাম। বাড়িতে থাকা অবস্থায় ঐ ভদ্রলোক আবার আমাদের বাসায় এলেন। তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। নাম বলার পর তিনি আমাকে অনেকটা হুকুমের সুরে বললেন, ‘আপনি আমার সাথে আসুন।’ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কোথায়? তিনি বললেন, ‘বঙ্গ ভবনে।’ আমি তখন আল্লাহর নাম করে তার সাথে রওনা হলাম। বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। গাড়িতে উঠার পর তারা গেলেন ফরিদ গাজীর বাড়িতে। ফরিদ গাজীর চেহারা তখন উদভ্রান্ত, ভীত, জড়সড়। তাকেও গাড়িতে ওেতালা হলো। এরপর গাড়ি থামল বঙ্গভবনে। ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে গিয়ে দেখি শপথ গ্রহণ চলছে। অনেকে দাঁড়ানো, অনেকে বসা। অবস্থা ভীতিকর। আমার নাম ধরে ডাকা হলো। পরিস্থিতি তখন এমন যে আমাকে শপথ নিতে হলো। ফরিদ গাজীও শপথ নিলেন। শপথ নেয়ার পর এক পিয়নকে ডেকে বললাম, মাগরিবের নামাজ পড়ব। সে একজন অফিসারকে বলল। তখন খন্দকার মোশতাক আমাকে ইশারা করলেন। তার ইশারায় কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু একটু পরেই তিনি নামাজের কথা বললেন। সবাই এক সাথে নামাজ পড়া হলে চায়ের কথা বললেন।
প্রশ্ন : হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ না করেই শপথ নিলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঃ তখনকার পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে। আমরা সবাই একটা গন্ডির মধ্যে আটকা ছিলাম। ঢাকায় তখন ভীতিপ্রদ অবস্থা। একটা লোকও বের হচ্ছে না। রাস্তায় রাস্তায় ট্যাংক যাতায়াত করছে রাস্তাগুলো ভাংচুড় করতে করতে। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীদের সবাইকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সবাই মোস্তাকের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়। আবু সাঈদ চৌধুরীর মত বিশ^খ্যাত ব্যক্তিও শপথ নিচ্ছেন মন্ত্রী হিসেবে! অথচ তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন!
প্রশ্ন : আপনারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় চার জাতীয় নেতাকে জেলে হত্যা করা হলো! নিশ্চয়ই এটা আপনার সরকারের পরিকল্পনাতেই হয়েছে?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : জেল হত্যার ব্যাপারে কিছু জানি না। এটা মিলিটারীদের ব্যাপার বলেই মনে হয়েছে। তারা কেন চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করল আমার বোধগম্য নয়। তবে চার নেতাকে হত্যার ঘটনায় আমি, ফরিদগাজী ও মোহাম্মদুল্লাহ ঘটনার পরদিন বঙ্গভবনে পদত্যাগ করতে গিয়েছিলাম।
প্রশ্ন : করলেন না কেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : আমি, ফরিদগাজী ও মোহাম্মদুল্লাহ। আমরা তিনজনে গিয়েছিলাম সন্ধ্যা প্রায় ৬টার দিকে। মোস্তাকের কাছে গিয়ে জেল হত্যার বিরুদ্ধে বলি। যেখানে জেলখানায় আমরা সহকর্মীদের নিরাপত্তা দিতে পারিনা সেখানে ক্ষমতায় থেকে কি হবে, এমন কথা বলি। আমাদের তিনজনের নেতা ছিলেন মোহাম্মদুল্লাহ। তিনি পদত্যাগের কথা বলেনর। তখন মোস্তাক বলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ আমি সে কথাই ভাবছি। সে জন্য সন্ধ্যায় কেবিনেটের মিটিং দিয়েছি। দয়া করে সবাই থাকবেন। কিছুক্ষণ পর কেবিনেটের সভা বসল। কিন্তু মিটিং এ কিছুই হলো না। কেবল মাত্র একজন আরেক জনের বিরুদ্ধে কটু মন্তব্য করলেন। ফলে পদত্যাগের ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু হলো না। মিটিং-এ হৈ চৈ শেষে এক সময় আমি খালেদ মোশাররফকে (৭ই নভেম্বর নিহত লেঃ কর্ণেল খালেদ মোশাররফ) বলেছিলাম যে, তিনি চা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে পারেন কি না। তখন খালেদ বলেন, ‘স্যার, মনে হচ্ছে কোন চেইন অব কমান্ড নাই। কেউ কারো কথা শুনছে না।’ মিটিং শেষে সেনা কর্মকর্তারা খন্দকার মোস্তাক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং কে এম ওবায়দুর রহমান বাদে অন্যদেরকে চলে যেতে বলেন। আমরা বঙ্গভবন ছেড়ে চলে আসি।
প্রশ্ন ঃ বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা মনে করেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : গোটা জাতি যাকে জাতির পিতা হিসাবে মেনে নিয়েছে আমি তাকে কেন মানব না? তাছাড়া বঙ্গবন্ধুকে আমি নেতা মেনেছি, এখনও মানি। তার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তিনি বিরাট মাপের লোক ছিলেন।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যার বিচার চান?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : নিশ্চয়ই বিচার চাই। আমি মনে করি তৃণমূল পর্যন্ত জাতির পিতা হত্যার বিচার হওয়া উচিত। তবে পলিটিক্সের মধ্যে বহু ষড়যন্ত্র থাকে, সে কারণে কিছুটা ভয় লাগে যে, নির্দোষ মানুষ ফেঁসে যায় কি না।
প্রশ্ন : মুজিব হত্যা, জেল হত্যার ব্যাপারে যদি সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান আপনার কাছ থেকে কিছু জানতে চায়, কি করবেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : যে কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছি।
প্রশ্ন : সরকারের পক্ষ থেকে অথবা ডিএসবি, এনএসআই এর তরফ থেকে কোন নির্দেশ আপনার কাছে এসেছে কি না? আপনার চলাচলে কোন বিধি নিষেধ আরোপ হয়েছে কি?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার পর হতে এ বাড়িতেই (দিনাজপুর জেলা শহরের কালিতলায়) আছি। কোন নিষেধ অথবা বিধি নিষেধ এখনও পাই নাই।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন, জিয়া হত্যার বিচার হওয়া উচিত?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : সব হত্যারই বিচার হওয়া উচিত।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেছিলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : সম্ভব ছিল না। মন্ত্রীপাড়া মিলিটারী দ্বারা চতুর্দিক দিয়ে ঘেরাও ছিল। কার্ফু ছিল। কার্ফুর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখতে কে যাবে?
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর সাথে শেষ দেখা কবে হয়েছিল?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : ১৩ আগষ্ট বিকেল বেলা গণভবনে সর্বশেষ দেখা ও কথা হয়েছিল। তখন তথ্য মন্ত্রী ছিলেন কোরবান আলী। তার মাধ্যমে রাশিয়া একটা সম্প্রচার কেন্দ্র দিয়েছিল। সেটা ওপেন করার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সেদিন আমার সাথে কথা বলেন। গণভবনে তার সাথে কিছুক্ষণ হেঁটেছিলাম। পেট অপারেশন করার পর থেকে তিনি তার সাথে আমাকে প্রতিদিন আধাঘন্টা হাঁটতে বলতেন। এটা কখনো হতো, কখনো হতো না।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করতে কখনো টুঙ্গিপাড়া গিয়েছিলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঃ যাইনি। যাওয়ার মত স্কোপ তৈরী হয়নি।
প্রশ্ন : ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত না থেকে পাল্টা আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন, কারণ কী ছিল?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : যে আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত ছিলাম না বলছেন, সেটা বাকশাল নীতিতে বিশ্বাস করত। আমি বাকশাল পছন্দ করতাম না। তাই পাল্টা আওয়ামী লীগ গঠণ করেছিলাম।
প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বন্ধুকের নলের মুখে মোস্তাকের মন্ত্রীত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরেও জিয়া, সাত্তার ও এরশাদের মন্ত্রী হয়ছিলেন! তখনো কি বন্দুকের নল ছিল?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঃ বন্দুকের নল ছিল না। তখন আমি মন্ত্রী হয়েছিলাম কাঞ্চন সেতুর স্বার্থে। কাঞ্চন সেতু ছিল আমার জীবনের স্বপ্ন, আমার পিতৃঋণ। সেই ছোট্ট থেকেই দেখেছি, এই কাঞ্চন নদী মানুষের কি ভয়াবহ দুর্দশার কারণ। পূণভর্বা ও ঢেপা নদীর মিলিত স্রোত দিনাজপুরে কাঞ্চন হিসেবে প্রবাহিত হতো। আমি যখন ছোট, কাঞ্চন তখন আজকের মত শীর্ণ ছিল না। সেই ৯-১০ বছর বয়স থেকে কাঞ্চন পারাপারের ভয়াবহ দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়েছে। তখন ওপারের (বিরল-সেতাবগঞ্জ-কাহারোল) লোকজনের ব্যবসা প্রধানত গরুর গাড়ি নির্ভর ছিল। কাঞ্চন নদী পারাপারের জন্য গরুর গাড়িওয়ালাদের কি দু:সহ কষ্ট করতে হতো, তা দেখেছি। গরু গাড়ি ওঠা নামার নির্দিষ্ট প্লাটফর্ম ছিল না। ফলে নৌকায় ওঠার প্রতিযোগিতা, হৈ-চৈ, মারামারি হতো। দুটো নৌকা জোড়া দিয়ে একটি ভাড় তৈরী করে তার ওপর দিয়ে গরু পার হতো, গাড়ি পার হতো। কাঞ্চন ঘাটে দেখেছি কাহারোল সেতাবগঞ্জ বিরলের লোককে, এমন কি আমার বাবা. চাচা যেহেতু ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তাদের ব্যবসা গরু গাড়ির ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেহেতু তাদের ভয়ানক দুঃখ কষ্ট ছোট থেকে দেখে এসেছি। আমার বালক মনে তার ছাপ ছিল। সেদিন কচি মনে ভাবতাম যে, যদি একটা ব্রীজ হতো, তাহলে মানুষের কি ভয়ানক দুঃখ কষ্টই না লাঘব হতো। মানুষের অসুখে-বিসুখে তখন ডাক্তার পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। নদী পার হয়ে গ্রামে কোন ডাক্তার যেতে চাইত না। আমি নিজে এবং আমার অনেক ছাত্র কি কষ্ট করে নদী পার হয়ে স্কুল, কলেজে আসতাম-যেতাম তা শুধু আমিই জানি। তাই লেখাপড়া ছেড়ে যখনই পলিটিক্স আরম্ভ^ করেছি তখন থেকে সেই পুরনো স্বপ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যদি কাঞ্চন সেতু করা যায়। সেজন্য যখনই কেউ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছেন তাকে অভিনন্দন জানিয়ে এই কাঞ্চন ব্রীজ তৈরীর দাবী জানাতাম।
আমি যখন ১৯৬২ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর মোনায়েম খাঁ’কে সেতুর কথা বলি এবং কাঞ্চন নদী পরিদর্শন করাই। কাঞ্চন ঘাটে লোক পারাপারের দৃশ্য দেখাই। কিন্তু ব্রীজ হয় নাই। এরপর ১৯৬৫ সালে যখন জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হই তখন আমি এবং দিনাজপুরের অন্যান্য সাংসদগণ ব্যক্তিগত ভাবে আইয়ুব খানের সাথে দেখা করে কাঞ্চন সেতু তৈরী ও কাঞ্চন ঘাট দেখার আমন্ত্রণ জানাই। এরপর তিনি (আইয়ুব খান) যখন পাবলিক মিটিং করতে এলেন তখন কাঞ্চন ঘাট দেখতে যান আমাদের আমন্ত্রণে। একই উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের যোগাযোগ মন্ত্রী আব্দুস সবুর খান দিনাজপুরে এলে তাকে ব্যক্তিগত ভাবে কাঞ্চন ঘাট দেখাতে নিয়ে যাই। কিন্তু ব্রীজ হয় নাই। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুকে আমি ও দিনাজপুরের অপর সাংসদগণ কাঞ্চন সেতুর কথা বলি। তিনি দিনাজপুরে কাঞ্চন সেতুর প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেন। সেতু করতে চেষ্টা করবেন বলে আশ^াস দেন, কিন্তু পারেন নাই।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর প্রায় বসেই ছিলাম। রাজনীতি করতাম না। পরে জিয়াউর রহমান আমাকে তার বাসায় ডেকে আমাকে তার সাথে থাকতে বলেন। আমি রাজি হইনি। তিনি টোপ দিলেন যে, আমি তার সাথে থাকলে কাঞ্চন সেতু করে দেবেন। সেতুর শর্তে তার সাথে থাকতে রাজী হলাম। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে তিনি নিহত হলেন। তাঁর মৃত্যুর ২দিন পরে সাত্তার সাহেব ডাকলেন। আমি গিয়ে বললাম, ক্ষমা করবেন, ক্যাবিনেট থেকে রিজেইন করছি। কিন্তু আমার বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই সাত্তার সাহেব বললেন, জিয়া আপনাকে কি বলেছে আমি জানি। আমি সাধ্যানুযায়ী তার প্রতিশ্রæতি রক্ষার চেষ্টা করব। এরপর নির্বাচনের ব্যাপারে সাত্তার সাহেব দিনাজপুরে এলেন। আমি তাকে কাঞ্চন সেতুর ব্যাপারে ঘোষণা দেবার অনুরোধ করলাম। সাত্তার সাহেব তখন এখানে আগত অন্যান্য মন্ত্রীদের সাথে সার্কিট হাউসে বৈঠক করলেন। বদরুদ্ধোজা চৌধুরী সাত্তার সাহেবকে বললেন আপনি কাঞ্চন সেতুর ব্যাপারে ঘোষণা দিতে পারেন। সাত্তার সাহেব কাঞ্চন সেতু তৈরীর প্রতিশ্রæতি দিয়ে পাবলিক মিটিংয়ে একটি ঘোষণা দেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলেন। ফলে সেই ঘোষণা আলোর মুখ দেখল না। তারপর এরশাদ সাহেব আমাকে ডাকলেন তার সহকর্মী হতে। তিনি কাঞ্চন সেতু দেবেন বলে প্রতিশ্রæতি দিলেন। তার প্রতিশ্রæতির আলোকে আমি তার সাথে থাকতে রাজি হলাম। যেদিন তিনি কাঞ্চন সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন সেদিন আমার ভাষণে আমি বলেছিলাম যে, এই সেতু দেওয়ার জন্য দিনাজপুরের মানুষ আপনাকে দোয়া করবে। এরশাদ যেন কাঞ্চন সেতুর ভিত্তি সম্পন্ন করতে না পারেন সে জন্য নানা তৎপরতা ছিল। তাকে কালো পতাকা দেখানো এবং বাধা দেয়ার কর্মসুচি ছিলো। আমি প্রায় শ’খানেক মটর সাইকেল নিয়ে ম্যুভ করি। কাঞ্চন ও এর আশে-পাশের এলাকায় এবং কাচারীতে গিয়ে লোকজনকে বলি, আপনারা ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন অনুষ্ঠানে আসেন। কারণ কাঞ্চন সেতুর দাবীর সাথে আমাদের প্রাণের সম্পর্ক আছে। আমি এরশাদের হেলিকপ্টার কাঞ্চন ঘাটেই নামানোর ব্যবস্থা করি, যেন তিনি কালো পতাকা বিংবা কোন বিক্ষোভের মুখে না পড়েন। এভাবে কাঞ্চন সেতুর ভিত্তি স্থাপিত হয়। যেদিন সেতুর ভিত্তি দেয়া হয়, সেদিনই মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেই। কাঞ্চন সেতু দিয়ে আমি পিতৃঋণ পরিশোধের চেষ্টা করেছি। আমার বাবা, আমার চাচা গাড়োয়ান ছিলেন, তাদের দুঃখ দুর্দশা আমি দেখেছি। কাঞ্চন সেতুর জন্যই চিরকালের জন্য আওয়ামী লীগ ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিয়েছিলাম।

স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক অধ্যাপক ইউসুফ আলী

দিনাজপুরের রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রয়াত অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী ছিরেন কিংবদন্তিতূল্য এক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জন্ম দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ফরক্কাবাদ গ্রামে, ১৯২৩ সালে । পিতা মরহুম মোঃ গফুরউদ্দীন সাহা, মাতাঃ মরহুমা মোছাঃ নছিরা খাতুন। মৃত্যু ১৯৯৮ সালের ৩ ডিসেম্বর। ২ পুত্র ও ৫ কন্যার জনক অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিরল-কাহারোল হতে জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামন্য অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন।
জন্মস্থান ফরক্কাবাদ গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দিনাজপুর একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। ১৯৪৪ সালে মেট্রিক পাস করেন। এরপর রিপন কলেজ হতে আই.এ এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজ হতে বি.এ পাস করেন । ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় হতে বাংলা ভাষা ও সহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সূত্রেই তার সাথে পরিচয় ঘটে বঙ্গবন্ধুর। পরিচয়ের সূত্রে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬০ সালে যোগ দেন রাজনীতির পোড়খাওয়া দল আওয়ামী লীগে। ১৯৬২ সালে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দিনাজপুর হতে পূর্ব পাকিস্তান আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবেও পাকিস্তান গণ-পরিষদে দ্বিতীয় বারের মত সদস্য নির্বাচিত হন।
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে এমএ ডিগ্রি লাভের পর প্রথমে রাজশাহীর নবাবগঞ্জ কলেজে, পরে দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যাপনা করেন। সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যাপনাকালে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় হতে বিএল ডিগ্রী নিয়ে দিনাজপুর বারে আইন পেশায় যোগ দেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের দায়েরকৃত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরোধী আন্দোলন, উনসত্তুরের গণ আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনসহ সকল গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন এবং নেতৃত্ব দেন।
তিনি মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হিসেবে সেই সময়ের উত্তাল ও ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দিনাজপুরে দলকে যোগ্যতরভাবে নেতৃত্ব দেন। রাজনৈতিক কারণে বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের আ¤্রকাননে মুজিবনগর সরকার গঠনের সময় স্বাধীনতার ইস্তেহার পাঠ করে নিজেকে আলোকিত করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপুর্ণ অবদান এখন ইতিহাসের অংশ। স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ ছাড়া আরও অনেক গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন মুক্তিযুদ্ধে। তিনি মুজিবনগর সরকারের ইয়োথ কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এটা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্ট ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। এছাড়া এ এইচ এম কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে পরিচালিত সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের অনারারি মহাসচিবের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। কলকাতায় মুজিবনগর সরকারের প্রথম লিয়াজোঁ অফিস পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দিনাজপুরের এই কৃতি সন্তান।
তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম মন্ত্রী পরিষদের প্রভাবশালী সদস্য ছিরেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত প্রথম মন্ত্রীসভায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রী তিনি। পরে সকল রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠন হলে অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৭৫ সালে বাকশাল মন্ত্রীসভায় শ্রমমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি বাকশালের ¤্রমিক ফ্রন্ট পরিচালনার দায়িত্বেও ছিলেন।
১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে স্বপরিবারে হত্যার ঘটনা ঘটে যার জের ধরে বাংলাদেশের সেই সময়ের কুসুমাস্তীর্ণ রাজনীতিতে ব্যাপক পালাবদল ঘটে ও একটি অপরিচ্ছন্ন অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা পরিকল্পনার সাথে অভিযুক্ত খন্দকার মোশতাকের মন্ত্যীসভায় যোগ দিয়ে নিজের রাজনৈতিক জীবনকে কলংকিত করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। তিনি মোশতাক সরকারের শ্রম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ পালন করেন। শুধু তাই নয়, ১৯৭৭ সালে আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে আরেকটি নতুন আওয়ামী লীগের জন্ম দেন যার নেতৃত্বে ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। নতুন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। কিন্তু একটি দলের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক হওয়ার পরেও ১৯৭৭ সালের সাধারন নির্বাচনে দিনাজপুর-৭ আসন হতে প্রতিদন্ধীতা করে হেরে যান। ঐ নির্বাচনে তার মই মার্কা বিপুল ভোটে হেরে যায় মূল আওয়ামী লীগের (আব্দুল মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন) নৌকা মার্কার কাছে। অথচ নৌকার প্রার্থী সতীশ চন্দ্র রায় তখন ছিলেন একটি অপরিচিত মুখ।
ঐ নির্বাচনের কিছুদিন পর অধ্যাপক ইউসুফ আলী বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় বস্ত্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের মন্ত্রীসভায় পাট ও বস্ত্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন লে. জেনারেল হুসেইন মূহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর তিনি জাতীয় পার্টি নামের নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৮৫ সালে এরশাদের গড়া জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ১৯৮৬ সালে ত্রাণ ও পুনর্বসন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় এরশাদকে দিনাজপুরে নিয়ে এসে কাঞ্চন সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করান। কিন্তু এর কয়েক মাস পরই পদত্যাগ করেন এবং রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে অনেকটা নীরব জীবন যাপন করেন।
অধ্যাপক ইউসুফ আলী নরম সুরে কথা বলতেন। এই কারনে ‘মিঠা বাবাজী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এটা তার জন্য একসময় পজিটিভ ছিল থাকলেও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে সেই সরকারের মন্ত্রী পরিষদে যোগ দেয়ার কারনে তার ‘মিঠা বাবাজী’ পরিচয়টা অনেকে ব্যাঙ্গ অর্থে ব্যবহার করেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রসভায় যোগ দেয়ার বিষয়টিা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে অতিমাত্রায় বিতর্কিত করে। অথচ তিনি একজন সাহিত্য ও সংস্কৃতি মনা লোক ছিলেন। পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকতাও করেছেন অল্প সময়ের জন্য।
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে প্রথম সারির একজন সংগঠক হলেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় স্যালুট থেকে বঞ্চিত হন স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী এই নেতা। অবশ্য মোস্তাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দিলেও তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার কোন অভিযোগ কখনো উত্থাপিত হয় নাই। বঙ্গবন্ধু হত্যা প্রসঙ্গে আমি (আজহারুল আজাদ জুয়েল) তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ১৯৯৬ সালে, যা ১৯৯৬ সালের ১৮-২২ অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ৪ দিন দৈনিক তিস্তায় ‘একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ইউসুফ আলী/বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যার যে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো;
প্রশ্ন : আপনি বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, সেই প্রেক্ষাপট যদি বলতেন।
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনকালে মেহেরপুরে আমার উপর স্বাধীনতার সনদ পাঠের দায়িত্ব বর্তেছিল। ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রীদের শপথ বাক্য পড়ানোর দায়িত্বও ছিল আমার উপর। আমি মুজিবনগর সরকারে প্রথমত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির অনারারী সেক্রেটারী ছিলাম। সরকারের সিদ্ধান্ত ক্রমে ইয়োথ ক্যাম্পে কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছিলাম। আমাকে মুজিবনগর সরকারের হেড কোয়ার্টারে থাকতে হতো। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হতো। ক্যাবিনেটের প্রতি মিটিংয়ে যুবকদের রিক্রুট ও রিফিউজিদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হতো। আমার সেক্রেটারী ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের উইং কমান্ডার এস আর মির্জা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় নতুন মন্ত্রী পরিষদ গঠন করা হলে আমাকেও পূর্ণ মন্ত্রী রাখা হয়েছিল। ২৬ ডিসেম্বর এই মন্ত্রী পরিষদের শপথ হয়। কিন্তু ঐদিন আমি শপথ নিতে পারিনি। শপথ নিয়েছিলাম ২৮ ডিসেম্বর।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় থাকা পর্যন্তই আপনি মন্ত্রী ছিলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঃ তার মৃত্যুর সময়কাল পর্যন্ত মন্ত্রী ছিলাম।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হবে, এটা কত আগের থেকে জানতেন?
ইউসুফ : বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ব্যাপারে আগে টের পাইনি। আমি বলতাম, তার নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা হওয়া উচিত। কিন্তু তিনি নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন না। তিনি বলতেন, বাংলার মানুষ আমাকে ভালবাসে। কেউ আমার ক্ষতি করবে তা বিশ^াস করি না।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর কিভাবে জেনেছেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর দিন আমি মিন্টো রোডের ৯নং সরকারি বাসভবনে ছিলাম। আমার প্রাইভেট সেক্রেটারী কাইয়ুম সাহেব ছিলেন শুক্রাবাদে। রাত প্রায় পৌনে ৪টার দিকে আমার ওয়াইফ আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে বলে, কাইয়ুম সাহেব ডাকছেন। কাইয়ুম টেলিফোনে বললেন, ‘স্যার রেডিও আছে?’ বললাম, ‘আছে।’ তিনি বললেন, ‘অন করেন।’ আমি রেডিও অন করে স্তম্ভিত হয়ে মেজর ডালিমের বক্তব্য শুনলাম। ঐ সময় চারদিক থেকে গোলাগুলির শব্দও হচ্ছিল। আমার হাউজ গার্ড পুলিশকে বললাম, ‘দেখে আসো তো, কোথায় কি হচ্ছে?’ একজন বললেন, ‘স্যার, মনে হয় রমনা থানা আক্রমণ হয়েছে।’ হাউস গার্ড আন্দাজ করে এটা সেটা বললেও তারা বাইরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। এভাবে সকাল প্রায় হয়ে আসছিল। এমন সময়ই সৈনিক বোঝাই দুটো খোলা ট্রাককে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের দিকে এগিয়ে যেতে দেখতে পেলাম। তাদের আচরণ ঔদ্ধত্বপুর্ণ বলে মনে হলো। আমি ভয় পাই। কি করব ভাবতে থাকি। কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সকাল সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত কিংকর্তব্য বিমুড় অবস্থায় ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বাড়িতেই ছিলাম। আমার বাড়ির পেছনে যশোহরের সোহরাব হোসেনের বাড়ি ছিল। সকাল সাড়ে ছয়টায় পাঞ্জাবী-লুঙ্গি পড়ে, কাঁটা তারের বেড়া টপকিয়ে তার বাড়িতে গেলাম। তাকে প্রশ্ন করলাম, এখন কি করব? সোহরাবের বাড়ির পেছনে ছিল জয়েন্ট সচিব মনোয়ার হোসেনের বাড়ি। আমরা দু’জনে তার বাসার দরজার কাছে গেলাম। ঠক ঠক করে দরজায় টোকা দিলাম। আমাদের গলার আওয়াজে মনোয়ার নিজে বের হলেন। আমাদেরকে তাড়াতাড়ি ঢুকিয়ে নিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন। এর ২০-২৫ মিনিট পর মনোয়ারের বাড়িতে আমার ওয়াইফ ফোন করে জানতে চাইলেন যে, আমার কোন অসুবিধা হয়েছে কি না। জানালাম, আপাতত হয় নাই। ওয়াইফ জানালেন, তারও কোন সমস্যা হয় নাই। তবে তিনি এও জানালেন যে, একটি সামরিক ট্যাংক জঙ্গী ভাব নিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাক করে ছিল। এরপর ট্যাংকটি চলে গেছে। ওয়াইফের সাথে আলাপ হওয়ার ১০-১৫ মিনিট পর বালুবাড়ির দোস্ত মোহাম্মদ (দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের প্রাক্তন ক্লার্ক) আমাকে ফোন করেন এবং আমার অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন। বিকাল বেলা ওয়াইফ ফোন করে মনোয়ারকে জানাল যে, একজন ভদ্রলোক একটি গাড়িতে করে আমাদের বাসায় গিয়ে এক ঘন্টার ব্যবধানে পর পর দুইবার আমার খোঁজ করেছে।
প্রশ্ন : আপনি কি মনোয়ার সাহেবের বাড়িতে থেকে গেলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : স্ত্রী-সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিকেল বেলা বাড়িতে চলে এলাম। বাড়িতে থাকা অবস্থায় ঐ ভদ্রলোক আবার আমাদের বাসায় এলেন। তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। নাম বলার পর তিনি আমাকে অনেকটা হুকুমের সুরে বললেন, ‘আপনি আমার সাথে আসুন।’ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কোথায়? তিনি বললেন, ‘বঙ্গ ভবনে।’ আমি তখন আল্লাহর নাম করে তার সাথে রওনা হলাম। বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। গাড়িতে উঠার পর তারা গেলেন ফরিদ গাজীর বাড়িতে। ফরিদ গাজীর চেহারা তখন উদভ্রান্ত, ভীত, জড়সড়। তাকেও গাড়িতে ওেতালা হলো। এরপর গাড়ি থামল বঙ্গভবনে। ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে গিয়ে দেখি শপথ গ্রহণ চলছে। অনেকে দাঁড়ানো, অনেকে বসা। অবস্থা ভীতিকর। আমার নাম ধরে ডাকা হলো। পরিস্থিতি তখন এমন যে আমাকে শপথ নিতে হলো। ফরিদ গাজীও শপথ নিলেন। শপথ নেয়ার পর এক পিয়নকে ডেকে বললাম, মাগরিবের নামাজ পড়ব। সে একজন অফিসারকে বলল। তখন খন্দকার মোশতাক আমাকে ইশারা করলেন। তার ইশারায় কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। কিন্তু একটু পরেই তিনি নামাজের কথা বললেন। সবাই এক সাথে নামাজ পড়া হলে চায়ের কথা বললেন।
প্রশ্ন : হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ না করেই শপথ নিলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঃ তখনকার পরিস্থিতিটা বুঝতে হবে। আমরা সবাই একটা গন্ডির মধ্যে আটকা ছিলাম। ঢাকায় তখন ভীতিপ্রদ অবস্থা। একটা লোকও বের হচ্ছে না। রাস্তায় রাস্তায় ট্যাংক যাতায়াত করছে রাস্তাগুলো ভাংচুড় করতে করতে। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীদের সবাইকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সবাই মোস্তাকের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়। আবু সাঈদ চৌধুরীর মত বিশ^খ্যাত ব্যক্তিও শপথ নিচ্ছেন মন্ত্রী হিসেবে! অথচ তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন!
প্রশ্ন : আপনারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় চার জাতীয় নেতাকে জেলে হত্যা করা হলো! নিশ্চয়ই এটা আপনার সরকারের পরিকল্পনাতেই হয়েছে?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : জেল হত্যার ব্যাপারে কিছু জানি না। এটা মিলিটারীদের ব্যাপার বলেই মনে হয়েছে। তারা কেন চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করল আমার বোধগম্য নয়। তবে চার নেতাকে হত্যার ঘটনায় আমি, ফরিদগাজী ও মোহাম্মদুল্লাহ ঘটনার পরদিন বঙ্গভবনে পদত্যাগ করতে গিয়েছিলাম।
প্রশ্ন : করলেন না কেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : আমি, ফরিদগাজী ও মোহাম্মদুল্লাহ। আমরা তিনজনে গিয়েছিলাম সন্ধ্যা প্রায় ৬টার দিকে। মোস্তাকের কাছে গিয়ে জেল হত্যার বিরুদ্ধে বলি। যেখানে জেলখানায় আমরা সহকর্মীদের নিরাপত্তা দিতে পারিনা সেখানে ক্ষমতায় থেকে কি হবে, এমন কথা বলি। আমাদের তিনজনের নেতা ছিলেন মোহাম্মদুল্লাহ। তিনি পদত্যাগের কথা বলেনর। তখন মোস্তাক বলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ আমি সে কথাই ভাবছি। সে জন্য সন্ধ্যায় কেবিনেটের মিটিং দিয়েছি। দয়া করে সবাই থাকবেন। কিছুক্ষণ পর কেবিনেটের সভা বসল। কিন্তু মিটিং এ কিছুই হলো না। কেবল মাত্র একজন আরেক জনের বিরুদ্ধে কটু মন্তব্য করলেন। ফলে পদত্যাগের ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু হলো না। মিটিং-এ হৈ চৈ শেষে এক সময় আমি খালেদ মোশাররফকে (৭ই নভেম্বর নিহত লেঃ কর্ণেল খালেদ মোশাররফ) বলেছিলাম যে, তিনি চা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে পারেন কি না। তখন খালেদ বলেন, ‘স্যার, মনে হচ্ছে কোন চেইন অব কমান্ড নাই। কেউ কারো কথা শুনছে না।’ মিটিং শেষে সেনা কর্মকর্তারা খন্দকার মোস্তাক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং কে এম ওবায়দুর রহমান বাদে অন্যদেরকে চলে যেতে বলেন। আমরা বঙ্গভবন ছেড়ে চলে আসি।
প্রশ্ন ঃ বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা মনে করেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : গোটা জাতি যাকে জাতির পিতা হিসাবে মেনে নিয়েছে আমি তাকে কেন মানব না? তাছাড়া বঙ্গবন্ধুকে আমি নেতা মেনেছি, এখনও মানি। তার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তিনি বিরাট মাপের লোক ছিলেন।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যার বিচার চান?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : নিশ্চয়ই বিচার চাই। আমি মনে করি তৃণমূল পর্যন্ত জাতির পিতা হত্যার বিচার হওয়া উচিত। তবে পলিটিক্সের মধ্যে বহু ষড়যন্ত্র থাকে, সে কারণে কিছুটা ভয় লাগে যে, নির্দোষ মানুষ ফেঁসে যায় কি না।
প্রশ্ন : মুজিব হত্যা, জেল হত্যার ব্যাপারে যদি সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান আপনার কাছ থেকে কিছু জানতে চায়, কি করবেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : যে কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছি।
প্রশ্ন : সরকারের পক্ষ থেকে অথবা ডিএসবি, এনএসআই এর তরফ থেকে কোন নির্দেশ আপনার কাছে এসেছে কি না? আপনার চলাচলে কোন বিধি নিষেধ আরোপ হয়েছে কি?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার পর হতে এ বাড়িতেই (দিনাজপুর জেলা শহরের কালিতলায়) আছি। কোন নিষেধ অথবা বিধি নিষেধ এখনও পাই নাই।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন, জিয়া হত্যার বিচার হওয়া উচিত?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : সব হত্যারই বিচার হওয়া উচিত।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখেছিলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : সম্ভব ছিল না। মন্ত্রীপাড়া মিলিটারী দ্বারা চতুর্দিক দিয়ে ঘেরাও ছিল। কার্ফু ছিল। কার্ফুর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখতে কে যাবে?
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর সাথে শেষ দেখা কবে হয়েছিল?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : ১৩ আগষ্ট বিকেল বেলা গণভবনে সর্বশেষ দেখা ও কথা হয়েছিল। তখন তথ্য মন্ত্রী ছিলেন কোরবান আলী। তার মাধ্যমে রাশিয়া একটা সম্প্রচার কেন্দ্র দিয়েছিল। সেটা ওপেন করার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সেদিন আমার সাথে কথা বলেন। গণভবনে তার সাথে কিছুক্ষণ হেঁটেছিলাম। পেট অপারেশন করার পর থেকে তিনি তার সাথে আমাকে প্রতিদিন আধাঘন্টা হাঁটতে বলতেন। এটা কখনো হতো, কখনো হতো না।
প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করতে কখনো টুঙ্গিপাড়া গিয়েছিলেন?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঃ যাইনি। যাওয়ার মত স্কোপ তৈরী হয়নি।
প্রশ্ন : ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত না থেকে পাল্টা আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন, কারণ কী ছিল?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী : যে আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত ছিলাম না বলছেন, সেটা বাকশাল নীতিতে বিশ্বাস করত। আমি বাকশাল পছন্দ করতাম না। তাই পাল্টা আওয়ামী লীগ গঠণ করেছিলাম।
প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বন্ধুকের নলের মুখে মোস্তাকের মন্ত্রীত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরেও জিয়া, সাত্তার ও এরশাদের মন্ত্রী হয়ছিলেন! তখনো কি বন্দুকের নল ছিল?
অধ্যাপক ইউসুফ আলী ঃ বন্দুকের নল ছিল না। তখন আমি মন্ত্রী হয়েছিলাম কাঞ্চন সেতুর স্বার্থে। কাঞ্চন সেতু ছিল আমার জীবনের স্বপ্ন, আমার পিতৃঋণ। সেই ছোট্ট থেকেই দেখেছি, এই কাঞ্চন নদী মানুষের কি ভয়াবহ দুর্দশার কারণ। পূণভর্বা ও ঢেপা নদীর মিলিত স্রোত দিনাজপুরে কাঞ্চন হিসেবে প্রবাহিত হতো। আমি যখন ছোট, কাঞ্চন তখন আজকের মত শীর্ণ ছিল না। সেই ৯-১০ বছর বয়স থেকে কাঞ্চন পারাপারের ভয়াবহ দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়েছে। তখন ওপারের (বিরল-সেতাবগঞ্জ-কাহারোল) লোকজনের ব্যবসা প্রধানত গরুর গাড়ি নির্ভর ছিল। কাঞ্চন নদী পারাপারের জন্য গরুর গাড়িওয়ালাদের কি দু:সহ কষ্ট করতে হতো, তা দেখেছি। গরু গাড়ি ওঠা নামার নির্দিষ্ট প্লাটফর্ম ছিল না। ফলে নৌকায় ওঠার প্রতিযোগিতা, হৈ-চৈ, মারামারি হতো। দুটো নৌকা জোড়া দিয়ে একটি ভাড় তৈরী করে তার ওপর দিয়ে গরু পার হতো, গাড়ি পার হতো। কাঞ্চন ঘাটে দেখেছি কাহারোল সেতাবগঞ্জ বিরলের লোককে, এমন কি আমার বাবা. চাচা যেহেতু ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তাদের ব্যবসা গরু গাড়ির ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেহেতু তাদের ভয়ানক দুঃখ কষ্ট ছোট থেকে দেখে এসেছি। আমার বালক মনে তার ছাপ ছিল। সেদিন কচি মনে ভাবতাম যে, যদি একটা ব্রীজ হতো, তাহলে মানুষের কি ভয়ানক দুঃখ কষ্টই না লাঘব হতো। মানুষের অসুখে-বিসুখে তখন ডাক্তার পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। নদী পার হয়ে গ্রামে কোন ডাক্তার যেতে চাইত না। আমি নিজে এবং আমার অনেক ছাত্র কি কষ্ট করে নদী পার হয়ে স্কুল, কলেজে আসতাম-যেতাম তা শুধু আমিই জানি। তাই লেখাপড়া ছেড়ে যখনই পলিটিক্স আরম্ভ^ করেছি তখন থেকে সেই পুরনো স্বপ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যদি কাঞ্চন সেতু করা যায়। সেজন্য যখনই কেউ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছেন তাকে অভিনন্দন জানিয়ে এই কাঞ্চন ব্রীজ তৈরীর দাবী জানাতাম।
আমি যখন ১৯৬২ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর মোনায়েম খাঁ’কে সেতুর কথা বলি এবং কাঞ্চন নদী পরিদর্শন করাই। কাঞ্চন ঘাটে লোক পারাপারের দৃশ্য দেখাই। কিন্তু ব্রীজ হয় নাই। এরপর ১৯৬৫ সালে যখন জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হই তখন আমি এবং দিনাজপুরের অন্যান্য সাংসদগণ ব্যক্তিগত ভাবে আইয়ুব খানের সাথে দেখা করে কাঞ্চন সেতু তৈরী ও কাঞ্চন ঘাট দেখার আমন্ত্রণ জানাই। এরপর তিনি (আইয়ুব খান) যখন পাবলিক মিটিং করতে এলেন তখন কাঞ্চন ঘাট দেখতে যান আমাদের আমন্ত্রণে। একই উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের যোগাযোগ মন্ত্রী আব্দুস সবুর খান দিনাজপুরে এলে তাকে ব্যক্তিগত ভাবে কাঞ্চন ঘাট দেখাতে নিয়ে যাই। কিন্তু ব্রীজ হয় নাই। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুকে আমি ও দিনাজপুরের অপর সাংসদগণ কাঞ্চন সেতুর কথা বলি। তিনি দিনাজপুরে কাঞ্চন সেতুর প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেন। সেতু করতে চেষ্টা করবেন বলে আশ^াস দেন, কিন্তু পারেন নাই।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর প্রায় বসেই ছিলাম। রাজনীতি করতাম না। পরে জিয়াউর রহমান আমাকে তার বাসায় ডেকে আমাকে তার সাথে থাকতে বলেন। আমি রাজি হইনি। তিনি টোপ দিলেন যে, আমি তার সাথে থাকলে কাঞ্চন সেতু করে দেবেন। সেতুর শর্তে তার সাথে থাকতে রাজী হলাম। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে তিনি নিহত হলেন। তাঁর মৃত্যুর ২দিন পরে সাত্তার সাহেব ডাকলেন। আমি গিয়ে বললাম, ক্ষমা করবেন, ক্যাবিনেট থেকে রিজেইন করছি। কিন্তু আমার বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই সাত্তার সাহেব বললেন, জিয়া আপনাকে কি বলেছে আমি জানি। আমি সাধ্যানুযায়ী তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা করব। এরপর নির্বাচনের ব্যাপারে সাত্তার সাহেব দিনাজপুরে এলেন। আমি তাকে কাঞ্চন সেতুর ব্যাপারে ঘোষণা দেবার অনুরোধ করলাম। সাত্তার সাহেব তখন এখানে আগত অন্যান্য মন্ত্রীদের সাথে সার্কিট হাউসে বৈঠক করলেন। বদরুদ্ধোজা চৌধুরী সাত্তার সাহেবকে বললেন আপনি কাঞ্চন সেতুর ব্যাপারে ঘোষণা দিতে পারেন। সাত্তার সাহেব কাঞ্চন সেতু তৈরীর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাবলিক মিটিংয়ে একটি ঘোষণা দেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলেন। ফলে সেই ঘোষণা আলোর মুখ দেখল না। তারপর এরশাদ সাহেব আমাকে ডাকলেন তার সহকর্মী হতে। তিনি কাঞ্চন সেতু দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন। তার প্রতিশ্রুতির আলোকে আমি তার সাথে থাকতে রাজি হলাম। যেদিন তিনি কাঞ্চন সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন সেদিন আমার ভাষণে আমি বলেছিলাম যে, এই সেতু দেওয়ার জন্য দিনাজপুরের মানুষ আপনাকে দোয়া করবে। এরশাদ যেন কাঞ্চন সেতুর ভিত্তি সম্পন্ন করতে না পারেন সে জন্য নানা তৎপরতা ছিল। তাকে কালো পতাকা দেখানো এবং বাধা দেয়ার কর্মসুচি ছিলো। আমি প্রায় শ’খানেক মটর সাইকেল নিয়ে ম্যুভ করি। কাঞ্চন ও এর আশে-পাশের এলাকায় এবং কাচারীতে গিয়ে লোকজনকে বলি, আপনারা ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন অনুষ্ঠানে আসেন। কারণ কাঞ্চন সেতুর দাবীর সাথে আমাদের প্রাণের সম্পর্ক আছে। আমি এরশাদের হেলিকপ্টার কাঞ্চন ঘাটেই নামানোর ব্যবস্থা করি, যেন তিনি কালো পতাকা বিংবা কোন বিক্ষোভের মুখে না পড়েন। এভাবে কাঞ্চন সেতুর ভিত্তি স্থাপিত হয়। যেদিন সেতুর ভিত্তি দেয়া হয়, সেদিনই মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেই। কাঞ্চন সেতু দিয়ে আমি পিতৃঋণ পরিশোধের চেষ্টা করেছি। আমার বাবা, আমার চাচা গাড়োয়ান ছিলেন, তাদের দুঃখ দুর্দশা আমি দেখেছি। কাঞ্চন সেতুর জন্যই চিরকালের জন্য আওয়ামী লীগ ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিয়েছিলাম।

আজহারুল আজাদ জুয়েল
সাংবাদিক, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

এই পাতার আরো খবর -
১৫ই জুলাই, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
দিনাজপুর, বাংলাদেশ
ওয়াক্তসময়
সুবহে সাদিকভোর ৩:৫৬ পূর্বাহ্ণ
সূর্যোদয়ভোর ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
যোহরদুপুর ১২:১১ অপরাহ্ণ
আছরবিকাল ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
মাগরিবসন্ধ্যা ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
এশা রাত ৮:২৭ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়