দিনাজপুর বার্তা ২৪ | Dinajpur Barta 24

ব্রেকিং নিউজ
রবীন্দ্রনাথের যত দুঃখ
মোফাচ্ছিলুল মাজেদ এপ্রিল ২১, ২০২০, ৫:৪৮ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে ২৫৪ বার |

মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল :-
কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে বাংলা ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ সনে ইংরেজি ৮মে, ১৮৬১ খ্রস্টাব্দে মঙ্গলবার ভোর আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে কলকাতার ৬নং দ্বারকনাথ ঠাকুর লেনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন।
এই ঠাকুর পরিবারের গুণী ব্যক্তিরা অনেকেই আজ আমাদের কাছে অপরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বসূরী ও উত্তরসূরী তার ছেলেমেয়েরা, কেউই আমাদের কাছে তেমন পরিচিত নন। এমনকি আমরা অনেকেই জানি না তার ছেলেমেয়ে কয়টি, তারা কি করতেন এবং কিভাবে মারা গেলেন। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ ছিলেন ব্যাংক অব ইন্ডয়ার স্বনামধন্য স্বত্বাধিকারী, বহুসংখ্যক ব্যবসা-শিল্প প্রতিষ্ঠান কয়লা খনির মালিক প্রিন্স দ্বারকনাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬ খ্রি.)। রবি ঠাকুরের পিতা ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫ খ্রি.) ও সারদা দেবী ছিলেন কবির মাতা (১৮২৩-১৮৭৫ খ্রি.)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা দেবন্দ্রনাথ ঠাকুর মধ্য বয়সে রাজা রাম মোহন রায়ের (১৭৭২-১৮৩৩ খ্রি.) প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর থেকে এই পরিবারের সবাই ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারী হন।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সন্তানেরা হলেন (১) প্রথম কন্যার মৃত্যু নাম রাখার আগে (১৮৩৮ খ্রি.) সেই হিসেবে রবিন্দ্রনাথের ভাইবোনের সংখ্যা ছিল ১৫ জন। (২) ২য় সন্তান দ্বিজেনদ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪০-১৯২৬ খ্রি.)। (৩) সতেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় প্রথম আইসিএস (১৮৬৪ খ্রি.) কর্মজীবনে আহমেদাবাদের জেলা জজ (১৮৪২-১৯২৩ খ্রি.), (৪) হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৪-১৮৮৪ খ্রি.)। (৫) বিরেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৫-১৯১৫ খ্রি.)। (৬) কন্যা সৌদামিনী দেবী (১৮৪৭-১৯২০ খ্রি.)। (৭) স্বনামধন্য নাট্যকার জোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৮-১৯২৫ খ্রি.)। (৮) কন্যা সুকুমারী দেবী (১৮৫০-১৮৬৪ খ্রি.)। (৯) পূন্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৫১-১৮৫৭ খ্রি.)। (১০) কন্যা শরৎ কুমারী দেবী (১৮৫৪-১৯২০ খ্রি.)। (১১) দ্বীপ নির্বান কাব্য রচয়িতা বিখ্যাত মহিলা কবি শ্রী স্বর্ণ কুমারী দেবী (১৮৫৬-১৯৩২ খ্রি.)। (১২) কন্যা বর্ণ কুমারী দেবী (১৮৫৮-১৯৪৮ খ্রি.)। (১৩) সোমেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৫৯-১৯২২ খ্রি.)। (১৪) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১ খ্রি.)। (১৫) বুধেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬৩-১৮৬৪ খ্রি.) সর্ব কণিষ্ঠ সন্তান।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর পরিবারের ১৫ জন ভাইবোনের মধ্যে কনিষ্ঠতম অগ্রজ। মহির্ষর অনেক পূত্ররাই ছিলেন অসুস্থ, মস্তিষ্ক বিকৃতি কিংবা স্বল্পায়ু।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৩ খৃস্টাব্দে ৯ ডিসেম্বর বাংলা ২৪ অগ্রাহয়ণ ১২৯০ সনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর। বর্তমান বাংলাদেশে খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণ ডিহীড় জমিদারের সেরেস্তাদার বেনীরায় চৌধুরীর কন্যা মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় (মৃণালিনী দেবীর পৈত্রিক নাম ভবতারিনী দেবী)। মৃণালিনী দেবীর বয়স ছিল তখন মাত্র ১০ বছর (১৮৭৩-১৯০২ খ্রি.)। বিয়ে করতে যেতে হয়নি তাকে শ্বশুরবাড়ি। কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে ঘরের ছেলে ঘরেই নিতান্ত সাধারণ ঘরোয়া পরিবেশেই রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিল। ধুমধামের সম্পর্ক ছিল না তার মধ্যে। কবি রবীন্দ্রনাথের বিবাহিত জীবন ছিল মাত্র ১৯ বছরের মতো (১৮৮৩-১৯০২ খ্রি.)। এর মধ্যে তাঁর ৫ জন পুত্র-কন্যার জন্ম হয়। ১৯০২ খৃস্টাব্দের শেষের দিকে মাত্র ২৯ বছর বয়সে কবি পতœী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু হয় (১৮৭৩-১৯০২ খ্রি.)। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৪১ বছর। বিবাহিত জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন এরা হলেন পূত্র রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮-১৯৬৪) খ্রি., পুত্র শমীন্দ্রনাশ (১৮৯৬-১৯০৭ খ্রি.), প্রথমা কন্যা মাধুরীলতা বা বেলা (১৮৮৬-১৯১৮ খ্রি.), ২য় কন্যা রেনুকা বা রাণী (১৮৯১-১৯০৩ খ্রি.) ও ছোট কন্যা মীরা বা অতশী (১৮৯৪-১৯৬৯ খ্রি.)। শমীন্দ্রনাথ ১৯০৭ খৃস্টাব্দে মাত্র ১৩ বছর বয়সে কলেরায় মারা যান (১৮৯৪-১৯০৭ খ্রি.)। কন্যা রেনুকা বা রানী ১৯০৩ খৃস্টাব্দে মাত্র ১৩ বছর বয়সে য²ায় মারা যান (১৮৯৪-১৯০৩ খ্রি.) ও মীরা বা অতশী ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে ৭৫ বছর বয়সে মারা যান। বড় মেয়ে মাধুবীলতা বা বেলা ৩০ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন (১৮৮৬-১৯১৬ খ্রি.)। মাধুরীও তার মায়ের মত অকালে য²া রোগে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিল কবি বিহারি লালের পুত্র শরৎ কুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে। বিয়ের পর রবীন্দ্রনাথ শরৎকে বিলাতে পাঠিয়েছিলেন ব্যারিষ্টারী পড়তে। বিলাত থেকে ফিরে এসে মেয়ে এবং তাঁর জামাই শরৎ কুমার চক্রবর্তী জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়ীতে চার বছর ছিলেন এই ঠাকুর বাড়ীতে শরৎ কুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে কবির ছোট জামাই নগেন্দ্রনাথের বিবাদের সূত্র ধরে শরৎ কুমার বাড়ী ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে শ্রীরামপুরের পৈত্রিক নিবাসে চলে যান। এরপর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শরৎ কুমার চক্রবর্তীর সম্পর্কের ইতি ঘটে। এই টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে বুকভরা অভিমান নিয়ে বেলা মৃত্যুর দুয়ারে গিয়ে পৌঁছে। শ্রীরামপুরে গিয়ে বেলার অসুখ খুব খারাপের দিকে চলে যায়। রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিন গাড়িতে করে গিয়ে মেয়েকে দেখে আসতেন। বাবার হাত ধরে মেয়ে বসে থাকতো। তখন কবি বিহারী লালের ছেলে শরৎ কুমার চক্রবর্তী টেবিলের উপরে পা রেখে সিগারেট খেয়ে শ্বশুর রবীন্দ্রনাথের প্রতি অপমানকর মন্তব্য করতো। আর সে অপমান নীরবে সহ্য করে রবীন্দ্রনাথ দিনের পর দিন মেয়েকে দেখতে যেতেন। একদিন দেখতে গেছেন বেলাকে কিন্তু মাঝপথে শুনলেন বেলা যক্ষারোগে মারা গেছে। মেয়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে তিনি আর উপরে উঠলেন না। মেয়ের শেষ মুখটি না দেখে ফিরে এলেন বাড়িতে। তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন বাড়ীতে এসে তাঁর মুখে কোন শোকের ছায়া নেই। কাউকে বুঝতে দিলেন না, কি অসহ্য বেদনার মধ্য দিয়ে তিনি সন্তানকে হারিয়েছেন। এভাবে রবীন্দ্রনাথের জীবনের প্রতিটি আঘাত হয়ে উঠতো বেদনাভরা বিষন্নতার গান। মানুষের জীবনে দুঃখ আছে, মৃত্যু আছে, কিন্তু পৃথিবী এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। পৃথিবী অনন্তের দিকে ধাবিত। এটাই রবীন্দ্র সঙ্গীতের মুল সূর। তবুও আমরা চলবো, জীবন চলবে। অনন্তের সন্ধানী রবীন্দ্রনাথ, দুঃখ এবং মৃত্যুকে জয় করে জীবনকে করেছেন জীবন্ত। জীবিত অবস্থায় মাধুরীও সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখতেন। মাধুরীর মৃত্যুর পরে তাঁর কবিতা ও চিঠিপত্রাদি নিয়ে একখানা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কবির মাতা সারদা দেবী মারা যান ১৮৭৫ সালের ৮ মার্চ (১৮২৩-১৮৭৫ খ্রি.)। তখন কবির বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর ১০ মাস। রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও মারা যান ১৯০৫ সালে (১৮১৭-১৯০৫ খ্রি.)। ২য় কন্যা রেনুকা বা রাণীর বিয়ে হয়েছিল সেকালে ‘সবুজ পত্র’ পত্রিকার সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীর ছেলে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে। ছোট মেয়ে মিরা বা অতশীর বিয়ে হয়েছিল বরিশালের বামনচন্দ্রের ছেলে নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের কণিষ্ঠ জামাতা নগেন্দ্রনাথ খ্রিষ্টান হয়ে মিরা বা অতশীকে ছেড়ে চলে যায়। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী ও তাঁর পুত্রকন্যাসহ শিলাইদহে একনাগাড়ে কাটিয়েছেন ২ বছর (১৮৯৮-১৯০১ খ্রি.)। পারিবারিক এই দুটি বছরই হচ্ছে তার দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়। এপর পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে তিনি একে একে হারিয়েছেন ৪ জন প্রিয়জনকে- স্ত্রী মৃণালিনী দেবী (১৮৭৩-১৯০২ খ্রি.), কন্যা রেনুকা (১৮৯১-১৯০৩ খ্রি.) পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫ খ্রি.) এবং ছোট পুত্র শমীন্দ্রনাথ কলেরায় মারা যান (১৮৯৬-১৯০৭ খ্রি.) যা এ নিবন্ধে আগেই উল্লেক করা হয়েছে। অথচ কবি ছিলেন দীর্ঘায়ু। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে ছিলেন ৮০ বছর (১৮৬১-১৯৪১ খ্রি.)। কবি রবীন্দ্রনাথের ৫ প্রত্র-কন্যার মধ্যে একমাত্র দীর্য়ায়ু ছিলেন রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮-১৯৬৪ খ্রি.)। তিনি বেঁচে ছিলেন ৭৬ বছর। রথীন্দ্র ছিলেন সে আমলে নামকরা ব্যক্তি কিন্তু তিনি ছিলেন দারুণ প্রচারবিমুখ মানুষ। সারা জীবনে শান্তি নিকেতনের দায়িত্ব পালন এবং অবসরে তিনি ছবি এঁকে বিখ্যাত হয়েছিলেন। জীবন গঠনের শুরুতেই পিতার আশীর্বাাদ রথীন্দ্রনাথের মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। পরবর্তী জীবন তিনি শিক্ষা ও ত্যাগের দ্বারা মহৎ জীবন গড়ে তোলেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে তিনি বিশ্ব ভারতীর দায়িত্ব পালন করেন (১৯২১ সালের ২২ ডিসেম্বর বিশ্ব ভরতী প্রতিষ্ঠিত হয়)।
রথীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন খাঁটি বিজ্ঞানী ও শিল্পী। শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি কৃষি ও ফলিত বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার ছেলে রথীন্দ্রনাথ এবং তার বন্ধু পুত্র সন্তোষ চন্দ্র ও কনিষ্ঠ জামাতা নগেন্দ্রনাথকে আমেরিকা পাঠিয়েছিলেন কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য। কবির উদ্যোগেই ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ায় তাঁত শিল্প স্থাপিত হয়েছিল। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ সে আমলে একজন নামকরা চিত্রশিল্পী ছিলেন। রথীন্দ্রনাথের ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয় কলকাতার চৌরঙ্গী আর্ট স্কুলে ১৯৩২ সালে। তাঁর শিল্পকর্মের একক প্রদর্শনী ১৯৪৮ সালে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহার লাল নেহেরু উদ্বোধন করেন। এ ছাড়াও তিনি বাংলা ভাষায় অনেক মূল্যবান বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ জীবনে যোগ্য সমাদার ও প্রাপ্য সম্মান পাননি। অনেকেই আমরা তার সম্পর্কে জানি না। রথিন্দ্রনাথ ১৯৬৪ সালে ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন (১৮৮৮-১৯৬৪ খ্রি.)।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশে জমিদারির দায়িত্ব পালন করেছেন যথাক্রমে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে, রাজশাহীর পতিসরে ও পাবনার শাহজাদপুরে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম পূর্ববাংলায় জমিদারি দেখতে এসেছিলেন ১৮৭৬ সালে এবং শেষ বারে জমিদারি তদারকে এসছিলেন ১৯২২ সালে। কবিগুরুর বয়স তখন ৬১ বছর। সমগ্র এশিয়া খÐে তিনি সর্বপ্রথম ‘গীতাঞ্জলির’ জন্য ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়ে বিশ্ব সভায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ১৯১৩ সালে ১২ সেপ্টেম্বর সুইডিশ একাডেমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল পুরস্কারের অর্থ বাবদ দিয়েছিলেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০ সুইডিশ ফ্রাঙ্কের চেকটি। সে সময়ে তাঁর নোবেল প্রাইজের টাকার মূল্য ছিল ১ লাখ ৮ হাজার টাকা (প্রায় ১০১ বছর আগে)। ভাবতে অবাগ লাগে যে আজকের গ্রামীণ কৃষি ব্যাংক সেকালে বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম রাজশাহীর পতিসরে স্থাপন করেছিলেন। আর তার পাওয়া নোবেল প্রাজের ১ লাখ ৮ হজার টাকা এই রাজশাহীর পতিসরের কৃষি ব্যাংকে তিনি জমা রেখে গরীব চাষীদের অর্থ ঋণ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে “সরকারি ঋণ মওকুফ’ আইন প্রচলিত হলে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নোবেল প্রাইজের সেই সমুদয় অর্থ চাষীদের কাছেই থেকে যায়। নোবেল পুরস্কারের আসল টাকাও আর সে সময় ফেরত পাওয়া যায়নি।
তিনি স্কুলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। ১৭ বছর বয়সে বিলাতে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়েছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে নিজ নামে তাঁর প্রথম কবিতা (অভিলাষ) ছাপা হয় অমৃত বাজার পত্রিকায় (১৮৭৫ সালের ২৫ ফেব্রæয়ারি)। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বনফুল’ প্রকাশিত হয় (১৮৭৬ খ্রি.)।
স্ব-শিক্ষা ও সাধনায় তিনি একক অবদানে বাংলাভাষা ও সাহিত্যকে এতো সমৃদ্ধ করেছেন যার কোন তুলনা হয় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একাধারে শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, চিত্রশিল্পী, নাট্যকার, দার্শনিক, সঙ্গীত শিল্পী, সঙ্গীত রচয়িতা, সুরকার ও একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ সচেতন ব্যক্তি। তার সৃষ্টি সম্ভারে আমরা দেখতে পাই ১০ লক্ষাধিক শব্দ ভাÐারসহ ৫৬টি কাব্যগ্রন্থ, ৪টি গীতি গ্রন্থ, ১১৯ টি ছোটগল্প, ১৩ টি পত্র গ্রন্থ, ১২ টি উপন্যাস, ৯টি ভ্রমণ কাহিনী, ২৯টি নাটক, ১৯টি কাব্য নাট্য এবং গানের সংখ্যা ২ হাজার ২৩৫টি (আনুমানিক)। এ ছাড়াও তিনি ২৯৮টি বিলুপ্ত প্রায় লালনগীতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছেন। সম্ভবত আজ পর্যন্ত তিনি একক সর্ববৃহৎ লালন সংগ্রাহক। এ ছাড়াও তার ৩টি সেরা শিশুদের ছড়া ও কবিতার বই রয়েছে। সাহিত্য শিল্পের সকল শাখায় তিনি জ্বেলেছেন সৃষ্টির উজ্জল শিখা।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লোকান্তরীত হন ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট বাংলা ১৩৪৮ সনের ২২ শ্রাবণ। তিনি আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করতে শিখিয়েছেন। জীবনকে ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করতে শিখিয়েছেন। আমাদের চিত্তকে অসুন্দর, অকল্যাণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও সোচ্চার হতে আহবান জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছেন অতুলনীয় দীপ্তি। রবীন্দ্রনাথ বাঙালি ও বাংলা ভাষাকে বিশ্বের সাহিত্যের দরবারে মর্যাদার আসনে সু-প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের গর্ব ও প্রেরণার উৎস।

লেখক ঃ- সাহিত্যিক, কলামিস্ট, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

এই পাতার আরো খবর -
২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
দিনাজপুর, বাংলাদেশ
ওয়াক্তসময়
সুবহে সাদিকভোর ৫:১০ পূর্বাহ্ণ
সূর্যোদয়ভোর ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ
যোহরদুপুর ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
আছরবিকাল ৩:৩৮ অপরাহ্ণ
মাগরিবসন্ধ্যা ৫:১৪ অপরাহ্ণ
এশা রাত ৬:৩৫ অপরাহ্ণ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকীয়