দিনাজপুর বার্তা ২৪ | Dinajpur Barta 24

ব্রেকিং নিউজ
শুক্রবার প্রয়াত জননেতা এম. অব্দুর রহিম-এর ১ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণ সভা
মোফাচ্ছিলুল মাজেদ সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৭, ২:৫৫ অপরাহ্ণ | পড়া হয়েছে ১,৯১২ বার |

দিনাজপুরবার্তা২৪.কম :-

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মরহুম এ্যাডঃ এম. আব্দুর রহিম এর ১ম মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে  শুক্রবার সকাল ১০টায় দিনাজপুর গোর-এ শহীদ বড়ময়দানে এক স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে।

উক্ত স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও দিনাজপুরের প্রবীণ আইনজীবী মোহাম্মদ ইছাহক।

স্মরণ সভায় সভাপতিত্ব করবেন এম. আব্দুর রহিম সমাজ কল্যাণ ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি এ্যাডঃ আজিজুল ইসলাম জুগলু। উক্ত স্মরণ সভায় সকল স্তরের জনগনকে উপস্থিত থাকার জন্য এম. আব্দুর রহিম সমাজ কল্যাণ ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের কার্যকরী সভাপতি মোঃ সফিকুল হক ছুটু ও সাধারণ সম্পাদক চিত্ত ঘোষ অনুরোধ জানিয়েছেন।

প্রয়াত জননেতা এম. আব্দুর রহিম-এর বর্নাঢ্য জীবনবৃত্তান্ত ঃ-

এম আব্দুর রহিম ১৯২৭ সালের ২১ নভেম্বর দিনাজপুর সদর উপজেলার শংকরপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম মো. ইসমাইল সরকার ও মা মরহুমা দরজ বিবি।

অবস্থাপন্ন কৃষক পরিবারের ধর্মীয় অনুশাসন ও ধর্মের প্রতি বাবা ইসমাইল সরকারের আগ্রহের কারণেই মাদ্রাসা শিক্ষায় শুরু হয় তাঁর প্রথম পাঠ। ১৯৪২ সালে জুনিয়র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাজশাহী সরকারি মাদ্রাসা হতে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। এর পর ১৯৫০ সালে ১ম বর্ষে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। সেখান থেকে ভর্তি হন রংপুর কারমাইকেল কলেজে। কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ১৯৫৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বি এ পাশ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল এল বি ডিগ্রী অর্জন করার পর ১৯৬০ সালে আইনজীবী হিসেবে দিনাজপুর বারে আইন পেশা শুরু করেন।

ছাত্র অবস্থায় এম আব্দুর রহিম পাকিস্তান বিরোধী স্বাধিকার আন্দোলনে যুক্ত হন। রাজশাহী কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সকল কর্মসূচিতে সক্রিয়তার স্বাক্ষর রাখেন। কলেজের শহীদ মিনার নির্মাণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম লীগ সরকারের হক-ভাসানী- সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্টের একজন কর্মী হিসেবে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশ নেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার লিগ্যাল এইড কমিটির একজন সদস্য ছিলেন এম আব্দুর রহিম। আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের (দিনাজপুর সদর ও চিরিরবন্দর থানার আংশিক) সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। ১৩ এপ্রিল ৭১ পর্যন্ত দিনাজপুর হানাদার মুক্ত ছিল। পাক হানাদার বাহিনী দিনাজপুর আক্রমন করলে এম আব্দুর রহিমকে আহ্বায়ক করে দিনাজপুরে “মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করা হয়। মানবিক মূল্যবোধ আর দেশাত্ব বোধের চেতনায় উজ্জ্বীবিত হয়ে তিনি ভারতের পশ্চিম বঙ্গের পতিরাম, রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, বালুরঘাট, গঙ্গারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকার শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

৭১ এ ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন হলে গোটা দেশকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১১টি  বেসামরিক জোনে ভাগ করেন। মুজিব নগর সরকার এম আব্দুর রহিমকে পশ্চিম জোন-১ এর জোনাল চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন। শ্বরণার্থী শিবিরের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনা মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্ট এবং প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সংগ্রহ এবং ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব ছিল তার উপরে। উল্লেখ্য তাঁর প্রশাসনিক জোনের অধীনে ১১২ টি রিলিফ ক্যাম্প, ১২ টি যুব অভ্যর্থনা শিবির, ৬টি মুক্তি যোদ্ধা ক্যাম্পসহ ১ টি মুক্তিযোদ্ধা বাছাই ক্যাম্প ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ১৭ই ডিসেম্বর সদ্য স্বাধীনপ্রাপ্ত দেশে পশ্চিম জোন-১ এর চেয়ারম্যান হিসেবে বগুড়া জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৮ ডিসেম্বর সকাল ১১টায় দিনাজপুর গোর এ শহীদ বড় ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় মিত্রবাহিনীর এই অঞ্চলের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার ফরিদ ভাট্টি ও কর্ণেল শমসের সিং এর নেতৃত্বে একটি চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। স্বাধীনতার পর তিনি যুদ্ধবিদ্ধস্ত বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) অঞ্চল পূনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর এবং ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি তৎকালীন কংগ্রেস নেতা বাবু প্রণব মুখার্জীর সাথে বৈঠক করেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এম আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগ এনে তৎকালীন পাকিস্তানী সেনাশাসক তথাকথিত সামরিক ট্রাইবুন্যালে একতরফা বিচার করে যাবৎ জীবন কারাদন্ড সাজা প্রদান করেন। বিজ্ঞ আইনজীবি ও জনদরদী রাজনীতিক এম আব্দুর রহিম সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন, তখন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হিসাবে দল গঠনের গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক শাসকদের কোন প্রলোভনই তাঁকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ৭৫ পরবর্তিতে বেগম জোহরা তাজউদ্দিনকে আহবায়ক করে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ গঠন করা হলে তিনি আহবায়ক কমিটির সদস্য এবং পরবর্তিতে দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৮৪ এবং ১৯৮৬ সালে সামরিক বিরোধী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামরিক শাষক গোষ্ঠী তাকে গ্রেফতার করে দীর্ঘদিন কারাগারে আটক রাখে। এমনি আদর্শবান, সৎ, নিরহঙ্কার, নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন রাজনীতিবীদ বর্তমান প্রজন্মের কাছে অনুসরনীয়।

এম আব্দুর রহিম ১৯৯১ সালে দিনাজপুর সদর আসন থেকে পুনরায় জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘদিন দিনাজপুর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও দিনাজপুর জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে চাঞ্চল্যকর কিশোরী ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনের বলিষ্ঠতা তাঁকে দিনাজপুরের গণমানুষের কাছে আলোকিত করে।

একজন সৎ ও আদর্শবান রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় তিনি নেতৃত্বের আসনে থেকে দিনাজপুরের মানুষকে যুগিয়েছেন সাহস-অনুপ্রেরণা-উদ্দীপনা। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য তাঁকে অনেকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। রাজনীতিকে মানুষের সেবা-কল্যাণ আর মঙ্গলের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে তিনি সমাজ সেবায় ছিলেন একনিষ্ঠ। দিনাজপুর ডায়াবেটিক হাসপাতাল, চক্ষু হাসপাতাল, রেডক্রিসেন্ট হাসপাতাল সহ নানা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, হিন্দু উপসনালয়সহ দিনাজপুরের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে তিনি কান্ডারীর ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি রেডক্রস/ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি ও হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর বোর্ড অব গভনস এর সদস্য এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসিইটি ও ডায়াবেটিক সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন। তিনি জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি ও জাতীয় যক্ষা নিরোধ সমিতি প্রভৃতির জেলা ও কেন্দ্রীয়ভাবে কমিটির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর লেখা ‘ধর্মের মুখোশ’ ও ’৫ম সংশোধনীর মজেজা’ দুটি গ্রন্থ ব্যাপক সাড়া জাগায়।

তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লীতে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৭৪-মস্কোয় অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব রেডক্রস সোসাইটি কতৃক আয়োজিত মানবাধিকার বিষয়ে এক সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে পবিত্র হজব্রত পালন করেন।

১৯৫৬ সালের ১৭ জুন চিরিরবন্দর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের মরহুম শাহ্ আব্দুল হালিম এর কন্যা নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন এম আব্দুর রহিম।

তিনি দুই পুত্র ও চার কন্যার জনক। বড় ছেলে ইনায়েতুর রহিম বাংলাদেশ হাই কোর্টের মাননীয় বিচারপতি এবং ছোট ছেলে ইকবালুর রহিম বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের মাননীয় সদস্য এবং হুইপ। চার মেয়ে ডা. নাদিরা সুলতানা, ডা. নাসিমা সুলতানা, নাফিসা সুলতানা এবং নাজিলা সুলতানাসহ সন্তানরা শিক্ষা জীবন শেষে সকলে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

বর্ষিয়ান এই রাজনীতিবিদ ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে ঢাকায় বারডেম হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

এম আব্দুর রহিম মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন অকুতোভয় সৈনিক। তাঁর সততা নীতি, আদর্শ দেশাত্ববোধ, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা, রাজনৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদানের কথা দল মত নির্বিশেষে দেশবাসী শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখবে।

এই পাতার আরো খবর -
৮ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ
দিনাজপুর, বাংলাদেশ
ওয়াক্তসময়
সুবহে সাদিকভোর ৪:৪৪ পূর্বাহ্ণ
সূর্যোদয়ভোর ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
যোহরদুপুর ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
আছরবিকাল ৪:০৭ অপরাহ্ণ
মাগরিবসন্ধ্যা ৫:৪৬ অপরাহ্ণ
এশা রাত ৭:০২ অপরাহ্ণ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকীয়